"কনস্টান্টিনোপল বিজয়"
আজ ২৯ শে মে। ১৪৫৩ সালের এই দিনে ইস্তাম্বুল বিজয়ের দ্বারা রাসুলাল্লাহ (সা) এর ভবিষ্যৎবাণী সত্য প্রমাণ করেন সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহ(রহ)।
আজও তুরস্কের অনেক পিতামাতা তাদের আদরের সন্তানের নাম ‘মুহাম্মাদ ফাতিহ’ রেখে থাকেন। কেননা এ নামটি ইসলামী ইতিহাসের একটি গৌরবময় অধ্যায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।উসমানী খিলাফতের সপ্তম সুলতান সুলতান মুহাম্মাদ ফাতেহ ছিলেন একজন বীর যোদ্ধা ,যাঁর মাধ্যমে নবী করিম (সাঃ) এর এর একটি ভবিষ্যতবাণী সত্য হয়েছে।হযরত বিশর বিন সুহাইম (রাঃ) থেকে সে ভবিষ্যত বাণীটি বর্ণিত হয়েছে-
ﻟﺘﻔﺘﺤﻦ ﺍﻟﻘﺴﻄﻨﻄﻨﻴﺔ ﻓﻠﻨﻌﻢ ﺍﻷﻣﻴﺮ ﺃﻣﻴﺮﻫﺎ ﻭﻟﻨﻌﻢ ﺍﻟﺠﻴﺶ ﺫﻟﻚ ﺍﻟﺠﻴﺶ
“নিশ্চয়ই তোমরা কন্সট্যান্টিপোল বিজয় করবে।তার আমীর উত্তম আমীর হবে এবং সেই বাহিনী উৎকৃষ্টতম সেনাবাহিনী হবে।”(মুসনাদে আহমদ ৪/৩৩৫, হাদীস : ১৮৯৫৭; মুসতাদরাকে হাকেম ৫/৬০৩, হাদীস : ৮৩৪৯;মুজামে কাবীর, তাবারানী, হাদীস : ১২১৬)
মাত্র ২৪ বছর বয়সে তিনি বাইজেন্টাইন সম্রাজ্যের রাজধানী কন্সট্যান্টিপোল জয় করেন।১৬ই মুহরম ৮৫৫ হিজরী মোতাবেক ১৮ ফেব্রুয়ারী ১৪৪৫ খৃস্টাব্দে সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ উসমানী খিলাফতের দ্বায়িত্ব গ্রহণ করেন।তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর,কিন্তু অসম সাহস,অতুলনীয় প্রজ্ঞা, নিপুণ রণকৌশল ও গভীর ঈমানী জযবায় অল্প সময়েই তিনি তাঁর পূর্বসূরীদের ছাড়িয়ে যান।দীর্ঘ ৩০ বছর তিনি সম্রাজ্য পরিচালনা করেন।তাঁর শাসনামলে যেমন ইসলামের বিজয়াভিজানে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছিল তেমনি সকল শ্রেণীর ও ধর্মের মানুষ ন্যায়বিচার, জান-মালের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় ও মানবিক অধিকার লাভ করেছিল।প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল ইসলামী শাসনব্যবস্থার সুফল।
সুলতান মুহাম্মাদ ফাতেহ এর শাসনামল বিভিন্ন দিক থেকে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত।তবে যা তাঁকে উম্মাহর হৃদয়ে অমর করে রেখেছে তা হলো কন্সট্যান্টিপোল বিজয়।ধর্মীয়,রাজনৈতিক ও ভৌগলিক দিক থেকে কন্সট্যান্টিপোল ছিল পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর।খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতক থেকেই তা ছিল বাইজান্টাইন সম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নগরী।কন্সট্যান্টিপোল নগরীর তিন দিকে জল, একদিকে স্থল।পশ্চিমে বসফরাস প্রণালী,দক্ষিণে গোল্ডেন হর্ণ ও উত্তরে মারমারা উপসাগর।তাই ভৌগলিক দিক অবস্থানের কারণে একে তখন বিশ্বের সুরক্ষিত নগরীগুলোর মধ্যে গণ্য করা হত।এছাড়া নগরীর প্রতিরক্ষাব্যাবস্থাও ছিল অতুন্ত শক্তিশালী। গোটা নগরীর চারপাশে ছিল একাধিক দুর্ভেদ্য প্রাচীর ও সার্বক্ষণিক সশস্ত্র প্রহরা।দুই দিক সাগর দ্বারা বেষ্টিত এবং একদিকে ছিল দুই দেয়াল গভীর পরিখা দ্বারা সুরক্ষিত।এসব কারণে কন্সট্যান্টিপোল ছিল সে বিচারে এক অজেয় দুর্গ।এখানে মনে রাখতে হবে যে, সে যুগটা মিসাইল ও যুদ্ধবিমানের যুগ ছল না। তাই উপরোক্ত ব্যবস্থাগুলোই তখন নগরীর সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট ছিল।কন্সট্যান্টিপোল জয়ের জন্য সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ(রহ) তৎকালীন বিশ্বের সর্বাধুনিক রণপ্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন।সে সময়ের সবচেয়ে দূর পাল্লার কামান তিনিই তৈরি করেছিলেন।প্রস্তুতি সমাপ্ত করার পর তিনি অভিযান আরম্ভ করেন।
উসমানী সেনারা বারবার শহরের বাইরের পরিখা পার হওয়ার চেষ্টা করছিল,কিন্তু বাইজানটাইন সেনাদের শক্ত প্রতিরোধে সাময়িকভাবে পিছু হটে তারা।উসমানী সেনাবাহিনীর সদস্যরা বৃক্ষকাণ্ডের সাহায্যে পরিখার উপর সেতু নির্মাণ করে কিন্তু গ্রিকরা তা সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়।এভাবে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ চলতে থাকে।
ইতিমধ্যেই বাইজানটাইন সম্রাটকে সাহায্য করার জন্য চারটি যুদ্ধজাহাজ এসে পৌঁছায় অন্য খ্রিস্টান দেশ থেকে।সুলতান জাহাজগুলোকে আটকানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।
তার স্থল বাহিনী নগরীর পূর্ব দিকে অবস্থান নিল এবং নৌবাহিনীর জাহাজগুলো বসফরাস প্রণালীতে ছড়িয়ে পড়ল।কিন্তু বসফরাস প্রণালী থেকে ‘গোল্ডেন হর্ণে’ প্রবেশ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না।কেননা গোল্ডেন হর্নের মুখ শিকল দ্বারা বন্ধ করা দেওয়া হয়েছিল এবং বাইজেন্টাইন রণতরীগুলো সেখানে অবস্থান নিয়ে গোলা নিক্ষেপ করছিল।
প্রচন্ড যুদ্ধের পরও উসমানী নৌবহর গোল্ডেন হর্ন পদানত করতে সক্ষম হল না।অন্যদিকে বন্দর সুরক্ষিত থাকায় বাইজেন্টাইন বাহিনী তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল পূর্বদিকে,সুলতানের স্থল বাহিনীকে মোকাবেলা করার জন্য।তাই তাদের শক্তিকে বিভক্ত করার জন্য এবং দুই দিক থেকে একযোগে আক্রমণ করার জন্য উসমানী নৌবহরের গোল্ডেন হর্নে প্রবেশ করা ছিল অপরিহার্য।প্রায় দুই সপ্তাহ অবিরাম যুদ্ধের পরও নৌপথে বিজয়ের কোন লক্ষণ দেখা গেল না।
অবশেষে সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ এমন এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, যা পৃথিবীর যুদ্ধের ইতিহাসে একমাত্র বিরল ও বিস্ময়কর হয়ে আছে।পাশ্চাত্যের কট্টর ঐতিহাসিকরা পর্যন্ত এ ব্যাপারে বিস্ময় প্রকাশ না করে পারেনি। গিবনের মত ঐতিহাহিকও একে ‘মিরাকল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।সুলতান ফাতিহ (রহ) মুজাহিদদের আদেশ দিলেন রণতরীগুলো ডাঙ্গায় তুলে দশ মাইল পথ অতিক্রম করে গোল্ডেন হর্নে নামাতে হবে, এই দীর্ঘ পথ পুরোটাই ছিল পাহাড়ী উঁচুনিচু ভূমি। এর উপর দিয়ে সত্তরটি রণতরী টেনে নেয়া ছিল এককথায় অসম্ভব।কিন্তু সুলতান ফাতেহ এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন।
সুলতানের আদেশে ১০ মাইল পথ পুরো তক্তা বিছানো হল এবং তাতে চর্বি মাখিয়ে পিচ্ছিল করা হল এবং এর উপর দিয়ে রণতরীগুলো টেনে নিয়ে যাওয়া হল।এভাবে টিলা ও পাহাড়ের উপর দিয়ে এক রাতের মধ্যেই ৮৮ টি রণতরী তিনি গোল্ডেন হর্ণে প্রবেশ করাতে সক্ষম হলেন।৮৮ টি জাহাজের এই মিছিল সারারাত্রি মশালের আলোতে ভ্রমণ করেত থাকে।বাইজানটাইন সৈন্যরা কন্সট্যান্টিপোলের প্রাচীর থেকে বসফরাসের পশ্চিম তীরে মশালের দৌড়াদৌড়ি লক্ষ্য করে।কিন্তু অন্ধকারের কারণে কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি।
অবশেষে ভোরের আলো যখন রহস্যের পর্দা উন্মোচন করে দেয়,ততক্ষণে মুহাম্মাদ আল ফাতিহের রণতরীগুলো ও ভারী তোপখানা গোল্ডেন হর্নের উপরাংশে পৌঁছে গেছে।গোল্ডেন হর্নের মুখে প্রহরারত বাইজানটাইন নৌ সেনারা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে দেখল যে,উসমানী রণতরীগুলো মৃত্যুদূতের মতো তাদের পিছন দিক থেকে ধেয়ে আসছে।এই ঘটনা ত্থেকে একটি প্রবাদ তৈরি হল, “যখন পানির জাহাজ ডাঙ্গায় চলবে তখন বুঝবে কন্সট্যান্টিপোলের পতন অত্যাসন্ন।”
চূড়ান্ত আক্রমণের আগে সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ(রহ) বাইজেন্টাইন সম্রাট কন্সট্যান্টিনকে নগরী সমর্পণের পয়গাম পাঠালেন এবং নগরবাসীর জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিলেন, কিন্তু সম্রাট তা গ্রহণ করলেন না।এবার সুলতান চূড়ান্ত আক্রমণের প্রস্তুতি নিলেন।ঐতিহাহিকগণ বলেন, “আক্রমণের আগে সুলতান ফাতিহ (রহ) বাহিনীর অধিনায়কদের তলব করে সকল মুজাহিদিকে এই পয়গাম পৌঁছে দেওয়ার আদেশ করলেন যে,কন্সট্যান্টিপোলের বিজয় সম্পন্ন হলে রাসূলুল্লাহ(সাঃ) এর একটি ভবিষ্যত বাণী সত্য হবে এবং তাঁর একটি মুজিজা প্রকাশিত হবে। অতএব কারো মাধ্যমে যেন শরীয়াতের কোন বিধান লঙ্ঘিত না হয়।গীর্জা ও উপসানালয়গুলোর যেন অসম্মান না করা হয়,পাদ্রী,মহিলা,শিশু এবং অক্ষম লোকদের যেন কোন ধরনের কষ্ট না দেওয়া হয়…।”
৮৫৭ হিজরীর ২০ জুমাদাল উলার রজনী মুজাহিদগণ দোয়া ও ইবাদাতের মধ্যে অতিবাহিত করেন।ফজরের নামাজের পর সুলতান চূড়ান্ত আক্রমণের আদেশ দিলেন এবং ঘোষণা করলেন যে,“ইনশাআল্লাহ আমরা যোহরের নামাজ হাজিয়া সোফিয়ায় আদায় করব।”
এরপর নতুন করে গোলাবর্ষণ শুরু হয়।উসমানী বাহিনীর প্রচণ্ড গোলাবর্ষণে দুর্গের মজবুত দেয়ালে ভাঙ্গন ধরে।এই সময় সুলতান তার জেনেসারি সৈন্যদের নিয়ে তৃতীয়বারের মত শহরের উপর চরম আঘাত হানেন।
দ্বিপ্রহর পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে ভীষণ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলতে থাকে।কিন্তু বাইজানটাইন বাহিনী অসাধারণ বীরত্বে একটি সৈন্যও শহরে প্রবেশ করতে পারেনি। অবশেষে সুলতান তার বিশেষ বাহিনী জেনেসারি বাহিনীকে সাথে করে সেন্ট রোমান্স এর ফটকের দিকে অগ্রসর হন।জেনেসারি বাহিনীর প্রধান হাসান আগা তার ত্রিশ জন বীর সঙ্গীকে সাথে করে প্রাচীরের উপর আরোহণ করেন।হাসান ও তার আঠার সাথীকে প্রাচীর থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়।তারা শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন।অবশিষ্ট বারোজন প্রাচীরের উপর দৃঢ় অবস্থান করতে সক্ষম হন।তারপর উসমানী বাহিনীর অন্যান্য দলও একের পর এক প্রাচীরে আরোহণ করতে সক্ষম হন। এমনিভাবে কন্সট্যান্টিপোলের প্রাচীরে চন্দ্রখচিত লাল পতাকা উড়িয়ে দেয়া হয়।
গ্রিক সেনাপতি গোয়াসটিনিয়ান অসাধারণ বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে গুরুতর আহত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করতে বাধ্য হনে।এতে করে বাইজানটাইন সৈন্যদের মনোবল ভেঙে পড়ে।বাইজানটাইন সম্রাট কন্সট্যান্টিন এতক্ষণ বীরত্বের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছিল।কিন্তু সে তার কিছু অসাধারণ বীর যোদ্ধার সাহস হারানোর পর নিরাশ হয়ে পড়ে।সে উচ্চস্বরে বলে-“এমন কোন খ্রিস্টান নেই কি,যে আমাকে খুন করবে।” কিন্তু তার আহ্বানে সাড়া না পেয়ে সে রোম সম্রাট(কায়সারদ
ের) বিশেষ পোশাক খুলে দূরে নিক্ষেপ করে,উসমানী সেনাবাহিনীর উন্মত্ত তরঙ্গের মধ্যে প্রবেশ করে সত্যিকার সৈনিকের মত বীরত্বের সাথে লড়তে লড়তে নিহত হয়।তার মৃত্যতে ১১০০ বছরের বাইজেন্টানের সেই রোম সম্রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে ,যার সূচনা হয়েছিল প্রথম কন্সট্যান্টিনের হাতে এবং বিলুপ্তও হল আরেক কন্সট্যান্টিনের হাতে । তারপর থেকে কাযসার় উপাধিই ইতিহাসের উপখ্যানে পরিণত হয়ে যায়।
এভাবে ইহ-পরকালের সর্দার মহানবী (সাঃ) এর এই বাণী সত্যে প্রমাণিত হয়-“কায়সারের ধ্বংসের পর আর কোন কায়সার জন্ম নিবে না।”
আল্লাহ তাআলা তাঁর মুজাহিদ বান্দার কথাকে সত্য করেছেন।জোহরের সময় সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ (রহ) বিজয়ীর বেশে কন্সট্যান্টিপোল নগরীতে প্রবেশ করেন।ইংরেজী তারিখ হিসাবে দিনটি ছিল ২৯ মে ১৪৫৩ ঈ.। সেন্ট রোমান্সের উপর(বর্তমান নাম TOP KOPY) উসমানী পতাকা উড়ছিল। সুলতান ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে সিদজায় পড়ে গেলেন।
নগরীর অধিকাংশ খ্রিস্টান হাজিয়া সোফিয়ায় আশ্রয় নিয়েছিল।তারা এই বিশ্বাসে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল যে,মুসলমানরা এই পবিত্র গির্জা দখল করতে পারবে না।কারণ,খ্রিস্টানরা এই গির্জাকে ইশ্বরের পবিত্র গৃহ বলে বিশ্বাস করত।এই গির্জার একজন ধর্মীয় যাজক সাধারণ খ্রিস্টানদের প্রতিশ্রুতি দেন, “উসমানীরা রোমান বাহিনীকে তাড়া ককরে সেন্ট সোফিয়া গির্জার ওই জায়গা পর্যন্ত চলে আসবে,যেখানে সম্রাট কনস্টান্টাইনের নির্মিত পবিত্র স্তম্ভ রয়েছে।কিন্তু এর পরপরই শুরু হবে উসমানীদের বিপর্যয়।তখন আকাশ থেকে স্বর্গীয় দূত তলোয়ায় হাতে নেমে আসবেন এবং ঐ স্তম্ভের গোড়ায় অবস্থানকারী ধর্মীয় যাজকদের হাত তা তুলে দিবেন।স্বর্গীয় দূত যাজকে বলবেন,যাও প্রতিশোধ নাও।তখন ঐ যাজক দূতের দেয়া তলোয়ায় হাতে উসমানীদের হত্যা শুরু করবেন।পুরো আনাতোলিয়া থেকে তাদের ধাওয়া করে ইরানের সীমান্ত পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হবে।”
উসমানী বাহিনী যখন ঐ পবিত্র স্তম্ভ পার হয়ে হাজিয়া সোফিয়ার মূল ফটকে পৌঁছে যায় তখন গির্জায় আশ্রয়গ্রহণকারী খ্রিস্টানরা ঐশী সাহায্যের আশায় প্রহর গুণছিল।এমন সময় খোলা তলোয়ায় হাতে তাদের সামনে উপস্থিত হন সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহ।সেদিন গির্জায় আশ্রয় নেয়া একজন খ্রিস্টানকেও তিনি হত্যা করেননি,বরং সবাইকে নিরাপত্তা দিয়ে ইসলামের উদার সৌন্দর্যের পয়গাম পৌঁছে দেন তিনি।
সুলতান তাদেরকে অভয় দিলেন এবং তাদের জানমালের নিরাপত্তা দান করলেন।এরপর আযান দেওয়া হল।সাড়ে এগারো শত বছর যাবৎ যেখানে ‘তিন খোদা’র উপাসনা হচ্ছিল সেখানে আজ তাওহীদের ধ্বনি উচ্চারিত হল।সকল ছবি ও মূর্তি সরিয়ে ফেলা হল।মুসলিম বাহিনী জোহরের নামাজ হাজিয়া সোফিয়ায় আদায় করল।সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহ (রহ) একে মসজিদে পরিণত করার ফরমান জারি করলেন।কেননা প্রথমত কন্সট্যান্টিপোলের সম্রাট আত্মসমর্পণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল তাই সুলতান এই গীর্জাকে পূর্বাবস্থায় বহাল রাখতে বাধ্য ছিল না। তদুপরি এটি ছিল অর্থডক্স খ্রিস্টানদের কেন্দ্রীয় গির্জা ।তাই এর সাথে বহু কুসংস্কার ও অলৌকিকতার বিশ্বাস জড়িত হয়েছিল। এই কুসংস্কারের মূলোৎপাটন প্রয়োজন ছিল।কন্সট্যান্টিপোল বিজয়ের পর সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ (রহ) নগরীর খ্রিস্টান অধিবাসীদের জান-মালের নিরাপত্তা বিধান করলেন এবং তাদেরকে তাদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করেন।কন্সট্যান্টিপোল বিজয়ের এই ঘটনার পর কন্সট্যান্টিনোপল যা বর্তমানে ইস্তাম্বুল নামে পরিচিত উসমানী খিলাফতের রাজধানীর রূপ লাভ করে এবং বহু শতাব্দী পর্যন্ত আলমে ইসলামীর মধ্যে তার বিশেষ গুরুত্ব ছিল।
সম্ভবত এই ঐতিহাসিক ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল পরাজিত বাইজেন্টাইনদের সাথে সুলতান মুহাম্মাদের আচরণ। তিনি শহরের অধিবাসীদের হত্যা করেননি , বরং কর পরিশোধ থেকে অব্যাহতি দিয়ে তাদেরকে কনস্ট্যান্টিনোপোলে থেকে যেতে উৎসাহিত করেন। কনস্ট্যান্টিনোপোলের গ্রীক অর্থোডক্স বিশপকে তিনি শহরে থেকে যাওয়ার এবং তাঁর হয়ে শহরের খ্রিস্টানদের শাসন করার ব্যাপারে জোর প্রদান করেন। অন্যদিকে ইউরোপের অন্যান্য প্রান্তে “ধর্মীয় সহিষ্ণুতা” ছিল এক অপরিচিত এবং বিদেশী ধারণা। অমুসলিমদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে সুলতান মুহাম্মাদ ইসলামী নিয়ম-নীতির অনুসরণ করেন এবং কনস্ট্যান্টিনোপোলের খ্রিস্টানদেরকে তাদের নিজ ধর্ম পালনের অধিকার ও স্বাধীনতা প্রদান করেন। যুদ্ধ পরিচালনায় তাঁর দক্ষতা ও পারঙ্গমতা এবং একইসাথে ন্যায়পরায়ণ গুণাবলীসমূহের কারণে তিনি লাভ করেছেন ﺍﻟﻔﺎﺗﺢ (“আল-ফাতিহ্”, ইংরেজিঃ the Conqueror, বাংলায় “বিজেতা”) উপাধি, যে নামে ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।
তথ্যসূত্র-
১) জাহানে দিদাহ- শাইখুল ইসলাম
আল্লামা তাকী উসমানী (দা বা)
২) Encyclopedia of Islam
৩) wikipedia
৪)সুলতান কাহিনী(তামিম রায়হান)
৪) ইসলামের ইতিহাস
৫) Encyclopedia of World History
৬) History of Decline & Fall of
Roman Empire and History of
Christianity- Edward Gibbon
৭)মাসিক আল-কাউসার
( সংগৃহিত)
আজ ২৯ শে মে। ১৪৫৩ সালের এই দিনে ইস্তাম্বুল বিজয়ের দ্বারা রাসুলাল্লাহ (সা) এর ভবিষ্যৎবাণী সত্য প্রমাণ করেন সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহ(রহ)।
আজও তুরস্কের অনেক পিতামাতা তাদের আদরের সন্তানের নাম ‘মুহাম্মাদ ফাতিহ’ রেখে থাকেন। কেননা এ নামটি ইসলামী ইতিহাসের একটি গৌরবময় অধ্যায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।উসমানী খিলাফতের সপ্তম সুলতান সুলতান মুহাম্মাদ ফাতেহ ছিলেন একজন বীর যোদ্ধা ,যাঁর মাধ্যমে নবী করিম (সাঃ) এর এর একটি ভবিষ্যতবাণী সত্য হয়েছে।হযরত বিশর বিন সুহাইম (রাঃ) থেকে সে ভবিষ্যত বাণীটি বর্ণিত হয়েছে-
ﻟﺘﻔﺘﺤﻦ ﺍﻟﻘﺴﻄﻨﻄﻨﻴﺔ ﻓﻠﻨﻌﻢ ﺍﻷﻣﻴﺮ ﺃﻣﻴﺮﻫﺎ ﻭﻟﻨﻌﻢ ﺍﻟﺠﻴﺶ ﺫﻟﻚ ﺍﻟﺠﻴﺶ
“নিশ্চয়ই তোমরা কন্সট্যান্টিপোল বিজয় করবে।তার আমীর উত্তম আমীর হবে এবং সেই বাহিনী উৎকৃষ্টতম সেনাবাহিনী হবে।”(মুসনাদে আহমদ ৪/৩৩৫, হাদীস : ১৮৯৫৭; মুসতাদরাকে হাকেম ৫/৬০৩, হাদীস : ৮৩৪৯;মুজামে কাবীর, তাবারানী, হাদীস : ১২১৬)
মাত্র ২৪ বছর বয়সে তিনি বাইজেন্টাইন সম্রাজ্যের রাজধানী কন্সট্যান্টিপোল জয় করেন।১৬ই মুহরম ৮৫৫ হিজরী মোতাবেক ১৮ ফেব্রুয়ারী ১৪৪৫ খৃস্টাব্দে সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ উসমানী খিলাফতের দ্বায়িত্ব গ্রহণ করেন।তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর,কিন্তু অসম সাহস,অতুলনীয় প্রজ্ঞা, নিপুণ রণকৌশল ও গভীর ঈমানী জযবায় অল্প সময়েই তিনি তাঁর পূর্বসূরীদের ছাড়িয়ে যান।দীর্ঘ ৩০ বছর তিনি সম্রাজ্য পরিচালনা করেন।তাঁর শাসনামলে যেমন ইসলামের বিজয়াভিজানে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছিল তেমনি সকল শ্রেণীর ও ধর্মের মানুষ ন্যায়বিচার, জান-মালের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় ও মানবিক অধিকার লাভ করেছিল।প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল ইসলামী শাসনব্যবস্থার সুফল।
সুলতান মুহাম্মাদ ফাতেহ এর শাসনামল বিভিন্ন দিক থেকে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত।তবে যা তাঁকে উম্মাহর হৃদয়ে অমর করে রেখেছে তা হলো কন্সট্যান্টিপোল বিজয়।ধর্মীয়,রাজনৈতিক ও ভৌগলিক দিক থেকে কন্সট্যান্টিপোল ছিল পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর।খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতক থেকেই তা ছিল বাইজান্টাইন সম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নগরী।কন্সট্যান্টিপোল নগরীর তিন দিকে জল, একদিকে স্থল।পশ্চিমে বসফরাস প্রণালী,দক্ষিণে গোল্ডেন হর্ণ ও উত্তরে মারমারা উপসাগর।তাই ভৌগলিক দিক অবস্থানের কারণে একে তখন বিশ্বের সুরক্ষিত নগরীগুলোর মধ্যে গণ্য করা হত।এছাড়া নগরীর প্রতিরক্ষাব্যাবস্থাও ছিল অতুন্ত শক্তিশালী। গোটা নগরীর চারপাশে ছিল একাধিক দুর্ভেদ্য প্রাচীর ও সার্বক্ষণিক সশস্ত্র প্রহরা।দুই দিক সাগর দ্বারা বেষ্টিত এবং একদিকে ছিল দুই দেয়াল গভীর পরিখা দ্বারা সুরক্ষিত।এসব কারণে কন্সট্যান্টিপোল ছিল সে বিচারে এক অজেয় দুর্গ।এখানে মনে রাখতে হবে যে, সে যুগটা মিসাইল ও যুদ্ধবিমানের যুগ ছল না। তাই উপরোক্ত ব্যবস্থাগুলোই তখন নগরীর সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট ছিল।কন্সট্যান্টিপোল জয়ের জন্য সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ(রহ) তৎকালীন বিশ্বের সর্বাধুনিক রণপ্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন।সে সময়ের সবচেয়ে দূর পাল্লার কামান তিনিই তৈরি করেছিলেন।প্রস্তুতি সমাপ্ত করার পর তিনি অভিযান আরম্ভ করেন।
উসমানী সেনারা বারবার শহরের বাইরের পরিখা পার হওয়ার চেষ্টা করছিল,কিন্তু বাইজানটাইন সেনাদের শক্ত প্রতিরোধে সাময়িকভাবে পিছু হটে তারা।উসমানী সেনাবাহিনীর সদস্যরা বৃক্ষকাণ্ডের সাহায্যে পরিখার উপর সেতু নির্মাণ করে কিন্তু গ্রিকরা তা সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়।এভাবে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ চলতে থাকে।
ইতিমধ্যেই বাইজানটাইন সম্রাটকে সাহায্য করার জন্য চারটি যুদ্ধজাহাজ এসে পৌঁছায় অন্য খ্রিস্টান দেশ থেকে।সুলতান জাহাজগুলোকে আটকানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।
তার স্থল বাহিনী নগরীর পূর্ব দিকে অবস্থান নিল এবং নৌবাহিনীর জাহাজগুলো বসফরাস প্রণালীতে ছড়িয়ে পড়ল।কিন্তু বসফরাস প্রণালী থেকে ‘গোল্ডেন হর্ণে’ প্রবেশ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না।কেননা গোল্ডেন হর্নের মুখ শিকল দ্বারা বন্ধ করা দেওয়া হয়েছিল এবং বাইজেন্টাইন রণতরীগুলো সেখানে অবস্থান নিয়ে গোলা নিক্ষেপ করছিল।
প্রচন্ড যুদ্ধের পরও উসমানী নৌবহর গোল্ডেন হর্ন পদানত করতে সক্ষম হল না।অন্যদিকে বন্দর সুরক্ষিত থাকায় বাইজেন্টাইন বাহিনী তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল পূর্বদিকে,সুলতানের স্থল বাহিনীকে মোকাবেলা করার জন্য।তাই তাদের শক্তিকে বিভক্ত করার জন্য এবং দুই দিক থেকে একযোগে আক্রমণ করার জন্য উসমানী নৌবহরের গোল্ডেন হর্নে প্রবেশ করা ছিল অপরিহার্য।প্রায় দুই সপ্তাহ অবিরাম যুদ্ধের পরও নৌপথে বিজয়ের কোন লক্ষণ দেখা গেল না।
অবশেষে সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ এমন এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, যা পৃথিবীর যুদ্ধের ইতিহাসে একমাত্র বিরল ও বিস্ময়কর হয়ে আছে।পাশ্চাত্যের কট্টর ঐতিহাসিকরা পর্যন্ত এ ব্যাপারে বিস্ময় প্রকাশ না করে পারেনি। গিবনের মত ঐতিহাহিকও একে ‘মিরাকল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।সুলতান ফাতিহ (রহ) মুজাহিদদের আদেশ দিলেন রণতরীগুলো ডাঙ্গায় তুলে দশ মাইল পথ অতিক্রম করে গোল্ডেন হর্নে নামাতে হবে, এই দীর্ঘ পথ পুরোটাই ছিল পাহাড়ী উঁচুনিচু ভূমি। এর উপর দিয়ে সত্তরটি রণতরী টেনে নেয়া ছিল এককথায় অসম্ভব।কিন্তু সুলতান ফাতেহ এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন।
সুলতানের আদেশে ১০ মাইল পথ পুরো তক্তা বিছানো হল এবং তাতে চর্বি মাখিয়ে পিচ্ছিল করা হল এবং এর উপর দিয়ে রণতরীগুলো টেনে নিয়ে যাওয়া হল।এভাবে টিলা ও পাহাড়ের উপর দিয়ে এক রাতের মধ্যেই ৮৮ টি রণতরী তিনি গোল্ডেন হর্ণে প্রবেশ করাতে সক্ষম হলেন।৮৮ টি জাহাজের এই মিছিল সারারাত্রি মশালের আলোতে ভ্রমণ করেত থাকে।বাইজানটাইন সৈন্যরা কন্সট্যান্টিপোলের প্রাচীর থেকে বসফরাসের পশ্চিম তীরে মশালের দৌড়াদৌড়ি লক্ষ্য করে।কিন্তু অন্ধকারের কারণে কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি।
অবশেষে ভোরের আলো যখন রহস্যের পর্দা উন্মোচন করে দেয়,ততক্ষণে মুহাম্মাদ আল ফাতিহের রণতরীগুলো ও ভারী তোপখানা গোল্ডেন হর্নের উপরাংশে পৌঁছে গেছে।গোল্ডেন হর্নের মুখে প্রহরারত বাইজানটাইন নৌ সেনারা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে দেখল যে,উসমানী রণতরীগুলো মৃত্যুদূতের মতো তাদের পিছন দিক থেকে ধেয়ে আসছে।এই ঘটনা ত্থেকে একটি প্রবাদ তৈরি হল, “যখন পানির জাহাজ ডাঙ্গায় চলবে তখন বুঝবে কন্সট্যান্টিপোলের পতন অত্যাসন্ন।”
চূড়ান্ত আক্রমণের আগে সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ(রহ) বাইজেন্টাইন সম্রাট কন্সট্যান্টিনকে নগরী সমর্পণের পয়গাম পাঠালেন এবং নগরবাসীর জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিলেন, কিন্তু সম্রাট তা গ্রহণ করলেন না।এবার সুলতান চূড়ান্ত আক্রমণের প্রস্তুতি নিলেন।ঐতিহাহিকগণ বলেন, “আক্রমণের আগে সুলতান ফাতিহ (রহ) বাহিনীর অধিনায়কদের তলব করে সকল মুজাহিদিকে এই পয়গাম পৌঁছে দেওয়ার আদেশ করলেন যে,কন্সট্যান্টিপোলের বিজয় সম্পন্ন হলে রাসূলুল্লাহ(সাঃ) এর একটি ভবিষ্যত বাণী সত্য হবে এবং তাঁর একটি মুজিজা প্রকাশিত হবে। অতএব কারো মাধ্যমে যেন শরীয়াতের কোন বিধান লঙ্ঘিত না হয়।গীর্জা ও উপসানালয়গুলোর যেন অসম্মান না করা হয়,পাদ্রী,মহিলা,শিশু এবং অক্ষম লোকদের যেন কোন ধরনের কষ্ট না দেওয়া হয়…।”
৮৫৭ হিজরীর ২০ জুমাদাল উলার রজনী মুজাহিদগণ দোয়া ও ইবাদাতের মধ্যে অতিবাহিত করেন।ফজরের নামাজের পর সুলতান চূড়ান্ত আক্রমণের আদেশ দিলেন এবং ঘোষণা করলেন যে,“ইনশাআল্লাহ আমরা যোহরের নামাজ হাজিয়া সোফিয়ায় আদায় করব।”
এরপর নতুন করে গোলাবর্ষণ শুরু হয়।উসমানী বাহিনীর প্রচণ্ড গোলাবর্ষণে দুর্গের মজবুত দেয়ালে ভাঙ্গন ধরে।এই সময় সুলতান তার জেনেসারি সৈন্যদের নিয়ে তৃতীয়বারের মত শহরের উপর চরম আঘাত হানেন।
দ্বিপ্রহর পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে ভীষণ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলতে থাকে।কিন্তু বাইজানটাইন বাহিনী অসাধারণ বীরত্বে একটি সৈন্যও শহরে প্রবেশ করতে পারেনি। অবশেষে সুলতান তার বিশেষ বাহিনী জেনেসারি বাহিনীকে সাথে করে সেন্ট রোমান্স এর ফটকের দিকে অগ্রসর হন।জেনেসারি বাহিনীর প্রধান হাসান আগা তার ত্রিশ জন বীর সঙ্গীকে সাথে করে প্রাচীরের উপর আরোহণ করেন।হাসান ও তার আঠার সাথীকে প্রাচীর থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়।তারা শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন।অবশিষ্ট বারোজন প্রাচীরের উপর দৃঢ় অবস্থান করতে সক্ষম হন।তারপর উসমানী বাহিনীর অন্যান্য দলও একের পর এক প্রাচীরে আরোহণ করতে সক্ষম হন। এমনিভাবে কন্সট্যান্টিপোলের প্রাচীরে চন্দ্রখচিত লাল পতাকা উড়িয়ে দেয়া হয়।
গ্রিক সেনাপতি গোয়াসটিনিয়ান অসাধারণ বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে গুরুতর আহত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করতে বাধ্য হনে।এতে করে বাইজানটাইন সৈন্যদের মনোবল ভেঙে পড়ে।বাইজানটাইন সম্রাট কন্সট্যান্টিন এতক্ষণ বীরত্বের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছিল।কিন্তু সে তার কিছু অসাধারণ বীর যোদ্ধার সাহস হারানোর পর নিরাশ হয়ে পড়ে।সে উচ্চস্বরে বলে-“এমন কোন খ্রিস্টান নেই কি,যে আমাকে খুন করবে।” কিন্তু তার আহ্বানে সাড়া না পেয়ে সে রোম সম্রাট(কায়সারদ
ের) বিশেষ পোশাক খুলে দূরে নিক্ষেপ করে,উসমানী সেনাবাহিনীর উন্মত্ত তরঙ্গের মধ্যে প্রবেশ করে সত্যিকার সৈনিকের মত বীরত্বের সাথে লড়তে লড়তে নিহত হয়।তার মৃত্যতে ১১০০ বছরের বাইজেন্টানের সেই রোম সম্রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে ,যার সূচনা হয়েছিল প্রথম কন্সট্যান্টিনের হাতে এবং বিলুপ্তও হল আরেক কন্সট্যান্টিনের হাতে । তারপর থেকে কাযসার় উপাধিই ইতিহাসের উপখ্যানে পরিণত হয়ে যায়।
এভাবে ইহ-পরকালের সর্দার মহানবী (সাঃ) এর এই বাণী সত্যে প্রমাণিত হয়-“কায়সারের ধ্বংসের পর আর কোন কায়সার জন্ম নিবে না।”
আল্লাহ তাআলা তাঁর মুজাহিদ বান্দার কথাকে সত্য করেছেন।জোহরের সময় সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ (রহ) বিজয়ীর বেশে কন্সট্যান্টিপোল নগরীতে প্রবেশ করেন।ইংরেজী তারিখ হিসাবে দিনটি ছিল ২৯ মে ১৪৫৩ ঈ.। সেন্ট রোমান্সের উপর(বর্তমান নাম TOP KOPY) উসমানী পতাকা উড়ছিল। সুলতান ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে সিদজায় পড়ে গেলেন।
নগরীর অধিকাংশ খ্রিস্টান হাজিয়া সোফিয়ায় আশ্রয় নিয়েছিল।তারা এই বিশ্বাসে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল যে,মুসলমানরা এই পবিত্র গির্জা দখল করতে পারবে না।কারণ,খ্রিস্টানরা এই গির্জাকে ইশ্বরের পবিত্র গৃহ বলে বিশ্বাস করত।এই গির্জার একজন ধর্মীয় যাজক সাধারণ খ্রিস্টানদের প্রতিশ্রুতি দেন, “উসমানীরা রোমান বাহিনীকে তাড়া ককরে সেন্ট সোফিয়া গির্জার ওই জায়গা পর্যন্ত চলে আসবে,যেখানে সম্রাট কনস্টান্টাইনের নির্মিত পবিত্র স্তম্ভ রয়েছে।কিন্তু এর পরপরই শুরু হবে উসমানীদের বিপর্যয়।তখন আকাশ থেকে স্বর্গীয় দূত তলোয়ায় হাতে নেমে আসবেন এবং ঐ স্তম্ভের গোড়ায় অবস্থানকারী ধর্মীয় যাজকদের হাত তা তুলে দিবেন।স্বর্গীয় দূত যাজকে বলবেন,যাও প্রতিশোধ নাও।তখন ঐ যাজক দূতের দেয়া তলোয়ায় হাতে উসমানীদের হত্যা শুরু করবেন।পুরো আনাতোলিয়া থেকে তাদের ধাওয়া করে ইরানের সীমান্ত পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হবে।”
উসমানী বাহিনী যখন ঐ পবিত্র স্তম্ভ পার হয়ে হাজিয়া সোফিয়ার মূল ফটকে পৌঁছে যায় তখন গির্জায় আশ্রয়গ্রহণকারী খ্রিস্টানরা ঐশী সাহায্যের আশায় প্রহর গুণছিল।এমন সময় খোলা তলোয়ায় হাতে তাদের সামনে উপস্থিত হন সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহ।সেদিন গির্জায় আশ্রয় নেয়া একজন খ্রিস্টানকেও তিনি হত্যা করেননি,বরং সবাইকে নিরাপত্তা দিয়ে ইসলামের উদার সৌন্দর্যের পয়গাম পৌঁছে দেন তিনি।
সুলতান তাদেরকে অভয় দিলেন এবং তাদের জানমালের নিরাপত্তা দান করলেন।এরপর আযান দেওয়া হল।সাড়ে এগারো শত বছর যাবৎ যেখানে ‘তিন খোদা’র উপাসনা হচ্ছিল সেখানে আজ তাওহীদের ধ্বনি উচ্চারিত হল।সকল ছবি ও মূর্তি সরিয়ে ফেলা হল।মুসলিম বাহিনী জোহরের নামাজ হাজিয়া সোফিয়ায় আদায় করল।সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহ (রহ) একে মসজিদে পরিণত করার ফরমান জারি করলেন।কেননা প্রথমত কন্সট্যান্টিপোলের সম্রাট আত্মসমর্পণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল তাই সুলতান এই গীর্জাকে পূর্বাবস্থায় বহাল রাখতে বাধ্য ছিল না। তদুপরি এটি ছিল অর্থডক্স খ্রিস্টানদের কেন্দ্রীয় গির্জা ।তাই এর সাথে বহু কুসংস্কার ও অলৌকিকতার বিশ্বাস জড়িত হয়েছিল। এই কুসংস্কারের মূলোৎপাটন প্রয়োজন ছিল।কন্সট্যান্টিপোল বিজয়ের পর সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ (রহ) নগরীর খ্রিস্টান অধিবাসীদের জান-মালের নিরাপত্তা বিধান করলেন এবং তাদেরকে তাদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করেন।কন্সট্যান্টিপোল বিজয়ের এই ঘটনার পর কন্সট্যান্টিনোপল যা বর্তমানে ইস্তাম্বুল নামে পরিচিত উসমানী খিলাফতের রাজধানীর রূপ লাভ করে এবং বহু শতাব্দী পর্যন্ত আলমে ইসলামীর মধ্যে তার বিশেষ গুরুত্ব ছিল।
সম্ভবত এই ঐতিহাসিক ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল পরাজিত বাইজেন্টাইনদের সাথে সুলতান মুহাম্মাদের আচরণ। তিনি শহরের অধিবাসীদের হত্যা করেননি , বরং কর পরিশোধ থেকে অব্যাহতি দিয়ে তাদেরকে কনস্ট্যান্টিনোপোলে থেকে যেতে উৎসাহিত করেন। কনস্ট্যান্টিনোপোলের গ্রীক অর্থোডক্স বিশপকে তিনি শহরে থেকে যাওয়ার এবং তাঁর হয়ে শহরের খ্রিস্টানদের শাসন করার ব্যাপারে জোর প্রদান করেন। অন্যদিকে ইউরোপের অন্যান্য প্রান্তে “ধর্মীয় সহিষ্ণুতা” ছিল এক অপরিচিত এবং বিদেশী ধারণা। অমুসলিমদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে সুলতান মুহাম্মাদ ইসলামী নিয়ম-নীতির অনুসরণ করেন এবং কনস্ট্যান্টিনোপোলের খ্রিস্টানদেরকে তাদের নিজ ধর্ম পালনের অধিকার ও স্বাধীনতা প্রদান করেন। যুদ্ধ পরিচালনায় তাঁর দক্ষতা ও পারঙ্গমতা এবং একইসাথে ন্যায়পরায়ণ গুণাবলীসমূহের কারণে তিনি লাভ করেছেন ﺍﻟﻔﺎﺗﺢ (“আল-ফাতিহ্”, ইংরেজিঃ the Conqueror, বাংলায় “বিজেতা”) উপাধি, যে নামে ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।
তথ্যসূত্র-
১) জাহানে দিদাহ- শাইখুল ইসলাম
আল্লামা তাকী উসমানী (দা বা)
২) Encyclopedia of Islam
৩) wikipedia
৪)সুলতান কাহিনী(তামিম রায়হান)
৪) ইসলামের ইতিহাস
৫) Encyclopedia of World History
৬) History of Decline & Fall of
Roman Empire and History of
Christianity- Edward Gibbon
৭)মাসিক আল-কাউসার
( সংগৃহিত)